Friday, 07 February 2014 09:47

মুখের সাথে হৃদয়ও পুড়ে গেছে লুইম মিয়ার

1

দোয়ারাবাজার সংবাদদাতা :: শ্রমের দামে কেনা সামান্য অর্থ আর ছেলেকে নিয়ে মাস দুয়েক পরে নিজের বাড়িতে ফেরার কথা ছিল লুইম মিয়ার। কিন্তু তা আর হল না। নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেকে বাঁচালেও চোখের সামনে পুড়ে যেতে দেখলেন তার ১১ বছর বয়সী সন্তানকে।

ছেলে মারা গেছে নাকি বেঁচে আছে তা এখনো জানেন না তিনি। লুইম মিয়া নিজেও অনেকটা দগ্ধ হয়েছেন। বেঁচে যাবেন এ নিশ্চয়তা তারও নেই। বুক থেকে পুরো মুখমণ্ডল পুড়ে গেছে তার। কিন্তু এখন তার শরীরের চেয়েও বেশি যন্ত্রণা মনে। সন্তানের শেষ আকুতি তাকে প্রাণে মেরে ফেলছে প্রতিমুহূর্ত।
লুইম মিয়া (৫০)। গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠাইন উপজেলায়। জীবনের তাগিদে ভোলাগঞ্জে এসেছিলেন শ্রমের বিনিময়ে সামান্য অর্থ উপার্জনের জন্য। নিজের ১১ বছর বয়সী বাচ্চাকেও নিয়ে এসেছিলেন নিজের কর্মস্থলে। কিন্তু একটি দুর্ঘটনাই পাল্টে দিলো লুইম মিয়ার জীবন। শ্রমের দামে কেনা সামান্য অর্থ নিয়ে মাস দুয়েক পরে নিজের বাড়িতে ফেরার পথেই হানা দেয় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। 
কয়েকদিন বাড়িতে না যাওয়ার শূন্যতা গোছাতে সোমবার ছেলেকে নিয়ে নদীপথে নিজের গ্রামের বাড়ির উদ্যেশে রওয়ানা দিলে পথেই দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হন তিনি।
গাদাগাদি মানুষ, গাদাগাদি কাপড়চোপড়। ঘটনার আকস্মিকতায় কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই দাউ দাউ আগুন ছড়িয়ে যায় পুরো ট্রলারে। শিতের রাত, ঘন কুয়াশা, ট্রলারের ভেতর জ্বলে ওঠা আগুন, তার মাঝে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারপাশ, আর বাইরে গাঢ় অন্ধকার। এর মাঝে পালানোর পথ নেই। যেন অঘোষিত বন্দিদশায় আক্রান্ত হন সকল যাত্রী। এমন বিপদগ্রস্তদের মাঝে একজন হলেন- লুইম মিয়া। সাথে ছোট  বাচ্চা। হঠাৎ করে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরা আগুনে পুড়ে লুইম মিয়া নিজে পানিতে ঝাপ দিয়ে প্রাণ বাঁচালেও বাঁচাতে পারেননি নিজের সন্তান খোকন মিয়াকে। লুইম মিয়া এখন পর্যন্ত বেঁচে আছেন ঠিকই কিন্তু তাঁর বুক থেকে শুরু করে পুরো মুখমণ্ডল পুড়ে যায়। ঘটনার তিন চার দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছে তাঁর শিশু সন্তান খোকন মিয়া।
গতকাল সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১১ নং ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, আগুনে ঝলসে যাওয়া দেহ নিয়ে হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছেন তিনি লুইম মিয়া। মুখে কথা নেই। তাঁর বড় মেয়ে বাবার নির্ভার মুখে পানি তুলে দিচ্ছেন, দু’এক বার নরম খাবারও তুলে দিচ্ছেন। কথা শোনে লুইম মিয়া উদাস দৃষ্টিতে ফিরে তাকান মানুষের দিকে। কথা বুঝেন কিন্তু বলতে পারেন না। তাকালে বুঝা যায়- জ্বলন্ত আগুনে শরীর পোড়ালেও ভেতর পোড়াচ্ছে ছোট বাচ্চার নিখোঁজ সংবাদ। নিজে বাঁচলেও নিজের সন্তানকে বাঁচাতে না পারার কষ্টটা যেন তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছে। শব্দহীন কান্না তার চোখে মুখে। তাঁর ব্যাপারে দায়িত্তরত চিকিৎসকদের সাথে কথা বলার পর তারা জানালেন- লুইম মিয়া এখনো আশঙ্কামুক্ত নয়। মুখের পোড়া অংশটা শরীরের খুব বেশি ক্ষতি না করলেও বুকের পোড়া অংশটা খুব ক্ষতিকর। এজন্য কোনো কিছু বলা যাচ্ছে না বলে তারা জানান।
উল্ল্যেখ্য- গত সোমবার রাতে ভোলাগঞ্জ থেকে সুরমা নদী দিয়ে কিশোরগঞ্জ যাবার পথে দেড় শতাধিক যাত্রীবাহী ট্রলারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে মহিলা শিশুসহ ১২ জন মারা যান। এতে অগ্নিদগ্ধ হন আরো প্রায় অর্ধশত। এছাড়া দুর্ঘটনায় প্রায় অর্ধশত নিখোঁজ হন এবং এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অনেকে। অগ্নিকান্ডের ঘটনায় আহত অনেকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও গুরুতর আহত ১৭ জন সিলেট ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেন।